পাজ্ঞাবি গল্প
স্বর্গে এক রাত
‘মিসেস গুরবীর আত্মহত্যা করলেন।’ শুনে যে কেউ অবাক হয়ে যায়।
‘কয়েক দিন আগেই তো নিজের ছেলের বিয়ে
দিয়েছিলেন।’
‘শাশুড়ি-বওমা ঝগড়া করেছিল, নাকি ছেলে কিছু বলেছিল।’
‘বেচারী কত দুঃখ সহ্য করে ছেলে কে মানুষ
করেছিলেন আর এই হলো ফলাফল।’
‘ছেলে জন্মানোর আগেই উনি বিধবা হয়ে
যান।’
‘আজকালের ছেলে-মেয়েদের দিক থেকে তো শুধু
ঈশ্বরই মালিক। কত কষ্ট সহ্য করে মানুষ কর, আর তারপর এই ফলাফল।’
‘না, এটা সম্ভব নয়। যদি ছেলে-বউমা’র সাথে ঝগড়া হয়ে থাকতো, তাহলে বাড়িতেই আত্মহত্যা
করে থাকতেন, হোটেলে যাওয়ার কি দরকার ছিল?’
‘আমি শুনেছি, তিনি প্রতি বছর ই হোটেলে যেতেন।’
‘একাই?’
‘হ্যাঁ, একাই।’
‘একার হোটেলে কী কাজ? হয়তো কারো সঙ্গে সম্পর্ক ছিল, তার সঙ্গেই দেখা করতে যেতেন।’
‘হতে পারে। কিছু বলা মুশ্কিল।’
‘হয়তো তাঁর সঙ্গেই ঝগড়া হওয়াতে আত্মহত্যা
করেছেন।’
‘হ্যাঁ, প্রেমিকদের মেজাজ একটু নাজুক হয়। পরিবারের
সঙ্গে বা নিজেদের মধ্যে সামান্য বিতর্ক হলেই আত্মহত্যা করে ফেলে।’
‘এই কারণেই সংবাদপত্রে দেখা যায়, অমুকের প্রেমে আত্মহত্যা করে ফেলেছে
বা অমুক প্রমিক আত্মহত্যা করল।’
সাধারণ
মানুষের মুখে এই ধরনের আলোচনা চলছিল, আর মহিলাদের মধ্যে আলোচনার মূল বিষয়ও এটি।
হোটেল
মুনলাইট এর কক্ষ নং ৩২য়ে গত ১৪ বছর ধরে প্রতি বছর ৭ই মার্চ তিনি এসে এক রাত কাটিয়ে
যেতেন। তিনি সন্ধ্যা ছয়টায় আসতেন, রাতের খাবার খেয়ে এবং সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে সকাল ন’টায় চলে যেতেন। হোটেলের কর্মচারীরাও
বিস্মিত হতেন যে তিনি একাই আসতেন এবং ‘ডাবল বেড’ ঘরটি কেন বুক করতেন, কিন্তু কেউ সাহস করে প্রশ্ন করত না
বা ভাবত হোটেলের ব্যবসায় এ ধরনের কিছু প্রশ্ন করা চলে না। তাদের কাজ কেবল গ্রাহকের
সেবা করা, অনুসন্ধান করা নয়।
প্রথম
চার-পাঁচ বছর তিনি পরের বছরের জন্য ঘর আগে থেকেই বুক করতেন। পরে ম্যানেজার নিজেই আগামী
বছরের জন্য ঘর বুক করে দিতেন এবং যখন তিনি বিল পে করতেন, তখন বলতেন, ‘ম্যাডাম, পরের বছরের জন্য আপনার ঘর বুক করে
দিয়েছি।’
‘ধন্যবাদ।’ তিনি বলতেন।
‘ইটস্ অল রাইট!’ হেসে ম্যানেজার বলত।
এটি
ছিল পনেরোতম বার, না পনেরোতম নয়, ষোলোতম বার যখন মিসেস গুরবীর মুনলাইটের ৩২ নম্বর ঘরে এসেছিলেন। তাকে মিসেস গুরবীর
বলা ঠিক নয়, আবার মিস গুরবীর ও নয়। এই ‘মিসেস’ আর ‘মিস’-এর মধ্যে ঠিক ততটাই পার্থক্য, যতটা পনেরোতম আর ষোলোতম বারের মধ্যে। তাকে ‘মিসেস’ বলা যায় না কারণ তাঁর বিয়ে হয়নি, আর ‘মিস’ বলা যায় না কারণ তিনি একটি পূত্র
কে জন্ম দিয়েছিলেন, যার বিয়ে কিছুদিন আগেই তিনি দিয়েছেন।
যদিও
তিনি না তো মিসেস, না ই মিস, তবুও লোকে তাঁকে মিসেস গুরবীর কৌর বলেই চিনত।
মিসেস
গুরবীর ঠিক ছ’টায় ঘরে ঢুকলেন। নিজের অ্যাটাচি আলমারিতে রেখে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। ধীরে-ধীরে গোটা
ঘরটায় চোখ বুলালেন। সবকিছুই ছিল আগের বছরের মতো ই। যদি কোনো পার্থক্য
থেকে থাকে, তবে তা পঁচিশ বছর আগের সেই সময়ের সঙ্গে, যখন তিনি প্রদ্যুম্নের সঙ্গে এখানে
এসেছিলেন। ঘরটি একই ছিল, কিন্তু সাজসজ্জায় পরিবর্তন ছিল। পর্দা আরও সুন্দর, বিছানার চাদর ডিজাইন করা, চেয়ারগুলোর জায়গায় সোফা, আর সেন্টার টেবিলও আগের থেকে ভালো।
তারপর
তাঁর মনে পড়ল, যখন প্রথমবার প্রদ্যুম্ন তাঁকে কোনো হোটেলে রাত কাটানোর কথা বলেছিল।
‘গুরবীর, আমাদের বিয়েতে না তো তোমার মা–বাবা প্রস্তুত, না আমার।’
‘হ্যাঁ।’
‘বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করতে তুমি রাজি
নও।’
‘হ্যাঁ, তুমি তো জানো বাবা…!’
‘হ্যাঁ, জানি তোমার বাবা হৃদরোগী এবং হাই ব্লাড
প্রেসারও আছে। একবার হার্ট অ্যাটাকও হয়েছে।’—প্রদ্যুম্ন একটু কটাক্ষ করে বলল।
‘প্রদ্যুম্ন, আমি শুধু এইটুকুই বলতে চাই যে আমি আমার
বাবা কে ভীষণ ভালোবাসি।’
‘আর আমাকে?’ প্রদ্যুম্ন মাঝখানেই থামিয়ে দিল।
‘তোমাকেও।’
‘যদি ভালোবাসতে…।’
‘তুমি নারী–মনের কী-ই বা জানো!’
‘নারীর মন বলে কিছু আছে নাকি?’
‘নারীর এই মনটার কারণেই তো আমি চাই না
যে আমাদের বিয়ে আমার বাবার মৃত্যুর কারণ হোক। আমি জানি তিনি আমাকে অসীম ভালোবাসেন, আর আমার এই পদক্ষেপ তিনি এক মিনিটও
সহ্য করতে পারবেন না।’
‘তাহলে আগেই সব চিন্তাভাবনা করে নেওয়া
উচিত ছিল।’
‘ভালোবাসা কখনও আগে থেকে চিন্তাভাবনা
করে করা যায়?’
কিছুক্ষণ
চুপ থাকার পর প্রদ্যুম্ন আবার বলল -
‘যদি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো, তবে একটা কথা রাখো।’
‘কি?’
‘আমি চাই, এক রাতের জন্য তুমি আমার স্ত্রী হও।
শুধু স্ত্রীই নয়, আমি তোমাকে সে রাতে নববধূরর সাজে দেখতে
চাই। সারা রাত তোমাকে ভালোবাসতে চাই, তোমার শরীরের প্রতিটি অঙ্গের চুম্বন করতে চাই।’ এক নিঃশ্বাসে সব বলে ফেলল প্রদ্যুম্ন।
কিছুক্ষণ
চুপ থেকে আবার বলল -
‘ওই রাতটা আমার কাছে স্বর্গে কাটানো
এক রাতের মতো হবে। ওই রাতের স্মৃতিতে আমি সারা জীবন কাটিয়ে দেব… অথবা ওই রাতের পর…।’ বলতে বলতে সে থেমে
গেল।
‘অথবা কি?’
‘কিছু না।’
‘আমি শুধু এটুকুই বলব গুরবীর, আমার জীবনে যদি কোনো কিছুর অপেক্ষা
থাকে, তবে শুধু ওই রাতের। এমনকি তুমি যদি
বার্ধক্যে এসে বলো, তখনও আমি তোমাকে ঠিক আজকের মতোই, একই উচ্ছ্বাসে ভালোবাসব।’
দু'জন অনেকক্ষণ একে অপরের দিকে তাকিয়ে
রইল। তারপর প্রদ্যুম্ন বলল—
‘আর একটা কথা…।’
‘কি?’
‘মনে আছে কি না জানি না, তুমি একদিন বলেছিলে যে তুমি বেগুন ভুর্তা
এমন সুস্বাদু রাঁধেো যে খাওয়ার সময় মানুষ চেটে-পুটে খেয়ে থাকে।’
‘হ্যাঁ, তা ঠিকই।’
‘সেই রাতে আমি তোমার হাতের রাঁধা ভুর্তাও
খেতে চাই।’
‘বল তো কালই বানিয়ে নিয়ে আসি?’
‘না, সেদিনই। আমি শুধু সেই রাতটার অপেক্ষায় থাকব।’
তাঁর
ভালোবাসা কে যেন ভূল না বোঝা হয়, তাই সে রাজি হয়ে গেল।
বাড়ির
লোকের অগোচরে প্রদ্যুম্নের সঙ্গে গিয়ে সে নববধূর পোশাক তৈরি করাল। যেদিন তাঁরা বাইরে
যাওয়ার পরিকল্পনা করল, সেদিন দুপুরে সে নিজের হাতে ভুর্তা
বানাল, টিফিনে একটু লুকিয়ে রেখে বলল - ‘এক বান্ধবীর বিয়েতে যাচ্ছি, কাল ফিরব।’
সন্ধে
ঠিক ছ’টায় তাঁরা মুনলাইট হোটেলের ৩২ নম্বর
ঘরে পৌঁছেছিল। রাতের খাবার খেল, সে নববধূর মতো সাজল।
তারপর প্রদ্যুম্ন ফুলসজ্জা রাতের মতো একে-একে করে তাঁকে অনাবরণ করল। সারা রাত প্রদ্যুম্ন
তার শরীরের প্রতিটি অংশ চুমু দিয়েছিল, আদর করেছিল। তাঁর শরীর ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল, সে ক্লান্ত ছিল—কিন্তু প্রদ্যুম্ন ছিল না, তার ঠোঁটও নয়।
সকালে
ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়ে প্রদ্যুম্ন তাঁকে বিদায় দেওয়ার সময় বলল যে সে একটু বিশ্রাম নিতে
চায়। বিদায় দেওয়ার আগে যখন শেষবারের মতো চুমু খেল, তখন অনেকক্ষণ তাকে আলিংগনে ধরে রাখল।
পরের
দিন সে জানতে পারল—এবং সংবাদপত্রে ও পড়ল—প্রদ্যুম্ন আত্মহত্যা করেছে। ‘স্বর্গে এক রাত’ শিরোনামে খবর বেরিয়েছিল। তার সঙ্গে
প্রকাশিত হয়েছিল প্রদ্যুম্নের রেখে যাওয়া চিঠি—
‘আমি স্বেচ্ছায় আত্মহত্যা করছি, এর জন্য কাউকে দায়ী করা যাবে না। মানুষ
স্বর্গে এক রাত কাটানোর পর নরকে কীভাবে যেতে পারে? আমি এক গল্পে পড়েছিলাম - গ্রিক সৌন্দর্যের দেবী ডায়ানাকে কেউ একবার স্নান করতে
দেখতে পেয়েছিল। তারপর সেই মানুষটি নিজেকে অন্ধ করে ফেলল। কারণ সে সৌন্দর্যের চরম দেখেছে, আর এরপর পৃথিবীর কুরূপতা দেখতে চায়নি।
মৃত্যুর সময় তার চোখে সেই সৌন্দর্যের ছবিই থাকবে। আমিও সেই কারণেই আত্মহত্যা করছি
- যাতে পৃথিবী ছেড়ে যাই সেই স্বাদের স্মৃতি নিয়ে, যা আমি স্বর্গে কাটানো এক রাত থেকে পেয়েছি। তাই আনন্দের সঙ্গেই পৃথিবী থেকে বিদায়
নিচ্ছি।’
সেদিন
গুরবীর ভীষণ কেঁদেছিল। কেঁদে-কেঁদে নিজের সর্বনাশ করে ফেলেছিল।
ঘটনার
এক-দেড় মাস পরই তার বমি-বমি ভাব শুরু হলো এবং বমিও হতে লাগল। তার মনে সন্দেহ জাগল এবং
সে এক লেডি ডাক্তারের কাছে চেক আপ করাতে গেল। তার ধারণা সত্যি হলো—সে মা হতে চলেছে।
অনেকদিন
ধরে তার মনে এক দ্বন্দ্ব চলতে লাগল—এই শিশুটিকে কী করবে? কখনও মনে হতো এটিকে নষ্ট করে দিক, আর পরেরক্ষণেই মনে হতো—যে মানুষ তাকে এত ভালোবেসেছিল, যে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত শুধু তারই
ছিল, তার সেই স্মৃতিচিহ্নটিকে কি সে রাখতে পারে না?
শেষ
পর্যন্ত সে স্থির করল—যে করেই হোক সে প্রদ্যুম্নের এই স্মৃতিচিহ্নকে আগলে রাখবে।
বাড়ির
লোক জানতে পারার আগেই সে নিজের ট্রাঁসফর চণ্ডীগড়ে নিল এবং ‘ওয়ার্কিং উইমেন হোস্টেলে’এ একটি ঘর ভাড়া নিল। হোস্টেলে কেউ তাঁকে
চিনত না, তাই কোনো অসুবিধা হয়নি। সে খুব সাদামাটা পোশাকে থাকত এবং যদি কেউ কিছু জিজ্ঞেস
করত, সে বলত—তাঁর স্বামীর এক্সিডেন্টে মৃত্যু হয়েছে এবং শ্বশুর–শাশুড়ি তাঁর স্বামীর মৃত্যুর জন্য তাঁকেই
দায়ী মনে করে। তাঁরা বলে—‘আমাদের সংসারে তুমি একজন অপয়া তাই আমাদের ছেলেকে হারিয়েছি।’ তাই সে ট্রাঁসফর নিয়ে হোস্টেলে থাকে—যাতে তাঁর স্বামীর শেষ স্মৃতিচিহ্নকে
আগলে রেখে মানুষ করতে পারে।
গুরবীরের
বাড়ির লোক যখন সব জানতে পারল, তারা নিজেদের বদনামের ভয়েই চুপ করে গেল। তারা মন কে সান্ত্বনা দিল যে তাঁদের মেয়ে
যেন মারা গেছে।
গুরবীর
একটি পুত্র কে জন্ম দিল, হুবহু প্রদ্যুম্নের মতো। তাঁর চোখ, নাক, মুখ—সবই প্রদ্যুম্নের প্রতিচ্ছবি। ছেলে
বড় হওয়াতে সে তাঁকে স্কুলে ভর্তি করাল এবং বাবার নামের জায়গায় লিখল—প্রদ্যুম্ন সিংহ।
প্রায়
দশ বছর সে মুনলাইট হোটেলে যায়নি—এই ভয়ে যে কেউ তাঁকে চিনে ফেলবে। একাদশ বছরে সাহস করে ৩২ নম্বর ঘর বুক করল। সেদিন
হোটেলে পৌঁছে সে খুশি হলো—কেউ তাকে চিনল না। কিছু স্টাফ বদলে গিয়েছিল, আর পুরোনো কেউ থাকলেও—কে আর মনে রাখবে সেই রাতের ঘটনাকে? যদি কেউ দেখেও থাকে, এতদিনে হয়তো ভুলে গেছে। তাঁর পর থেকে
সে প্রতি বছরই আগে থেকে সেই রাতের জন্য ঘর বুক করে রাখত।
সে
ঠিক ছ’টায় এসে পৌঁছাত। নিজের হাতে রাঁধা বিশেষ ভুর্তা আনত। একটু খাবার খেয়ে, তার অর্ধেকটা ভুর্তা খেয়ে নিত। তারপর
নববধূর মতো সাজত। তারপর একে একে নিজের পোশাক খুলত। নগ্ন হয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ত।
তার মনে হতো—প্রদ্যুম্ন তার শরীরের প্রতিটি অংশে চুমু খাচ্ছে, আগলে রাখছে।
সকালে
পোশাক পরে, নাশতা সেরে বিল মিটিয়ে সে ফিরে যেত। প্রতি বছরই একইরকম।
তার
ছেলে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করল, বি. এ., এম. বি. এ. করল এবং একটি কাপড়ের মিল-এ অ্যাসিস্ট্যান্ট সেলস ম্যানেজার হিসাবে চাকুরি
পেল। গত মাসেই সে নিজের পছন্দসই মেয়েকে বিয়ে করল। গুরবীরের সবচেয়ে আনন্দের বিষয় ছিল—তার ছেলে প্রেমবিবাহ করেছে, যা সে এবং প্রদ্যুম্ন করতে পারেনি।
ছেলে বউকে নিয়ে চলে গেল। ছেলেও বলেছিল—
‘মা, এখন তুমি চাকুরি ছেড়ে দাও, আমাদের সঙ্গে চলো।’
কিন্তু
সে বলল— ‘আর তো মাত্র কয়েকদিনের কথা। চাকরি কেন ছাড়ব? আমি তোমাদের কাছেই ট্রাঁসফর নিয়ে নেব।’
প্রতি
বছরের মতো এবারও সে ঠিক ছ’টায় মুনলাইট হোটেলের ৩২ নম্বর ঘরে পৌঁছল। রাতের খাবার খেল, নিজের রাঁধা ভুর্তার অর্ধেক খেল। নববধূর
মতো সাজল, একে একে নিজের পোশাক খুলল এবং বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করল। তার মনে হলো—প্রদ্যুম্ন তাঁকে ভালোবাসছে, চুমু খাচ্ছে, আদর করছে। সকালে উঠে ব্রেকফাস্ট
সেরে সে কাগজ নিয়ে লিখতে বসল—
আমার
চোখের মনিমুক্ত ও সোনামণি, আমাকে ক্ষমা করে দিও যে আমি তোমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছি। মন তো চায় তোমাদের সঙ্গে
থাকি, কিন্তু সোনামণিরা—আমি খুবই ক্লান্ত। গত পঁচিশ বছর তোমাদের বাবাকে ছাড়া কী ভাবে কাটিয়েছি, আমি নিজেই জানি। এখন আমি ক্লান্ত–শ্রান্ত। আমার যে উদ্দেশ্যে এতদিন বেঁচে
ছিলাম, সেটাও আজ পূর্ণ হলো। ঠিক আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে এই হোটেলের এই ঘরেই তোমার বাবা
আর আমি এক রাত কাটিয়েছিলাম—স্বর্গের মতো এক রাত। তোমার বাবার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়নি, কিন্তু সেই একটি রাত আমাদের চিরবন্ধনে
বেঁধে দিয়েছিল। দু’পক্ষের বাবা–মা আমাদের বিয়ে তে মত দেন নি, তাই তোমার বাবা আমাকে এক রাত তার সঙ্গে থাকার অনুরোধ করেছিল। ভালোবাসায় পাগলা হয়ে
আমিও রাজি হয়েছিলাম। সেই এক রাতের পরই তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। তুমি ছিলে সেই রাতের
স্মৃতি—যাকে আমি সযত্নে মানুষ করেছি। তোমার বিয়ে
দিয়ে আমি আমার কর্তব্য শেষ করেছি। মানুষ ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিয়ে তীর্থযাত্রায় যায় -
আমিও তীর্থযাত্রায় যাচ্ছি। আমার তীর্থ হল তোমার বাবা - তাঁর ভালোবাসা। আমি জানি তোমার
বাবাও আমার অপেক্ষায় আছেন। তাই তাঁর কাছে যাওয়ার জন্য আমি তোমাদের ছেড়ে যাচ্ছি। আমার
আশীর্বাদ ও ভালোবাসা সর্বদা তোমাদের সংগে রইল।’
মিসেস
গুরবীর চিরকুট টি কে একটি খামে ভরে তাঁর উপর ছেলের নাম লিখে দিলেন। হোটেলের বিলের
টাকা টি ও তাঁর সংগে ই রেখে দিলেন। জলের সংগে কয়েকটি বড়ি খেয়ে থালি গেলাসটি খাম ও
টাকার উপর রেখে দিয়ে শুয়ে পড়লেন।
000
সেই সময়, কোলকাতা, 08-02-2026
कोई टिप्पणी नहीं:
एक टिप्पणी भेजें