পঞ্জাবি গল্প জুত্তি কসূরী
0 খালিদ হুসেইন
অনুবাদ – নীলম শর্মা ‘অংশু’
নম্রতা আর আমি নৈনিতালের
আর্মি স্কুলে একসঙ্গে পড়তাম। পরে সে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর আমি কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়
থেকে ইংরেজিতে এম. এ. করেছি। এই সময় আমাদের মধ্যে টেলিফোনের মাধ্যমে নিয়মিত
যোগাযোগ বজায় ছিল। তারপর ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবার পরীক্ষার কোচিংয়ের জন্য
আমরা দু’জন আবার দিল্লিতে মিলিত হলাম। আমরা দু’জনেই প্রথম চেষ্টাতেই আই.এ.এস. পরীক্ষা পাশ করে নিলাম।
আমাকে জম্মু-কাশ্মীর স্টেট ক্যাডার দেওয়া হলো এবং নম্রতাকে মহারাষ্ট্র। নম্রতার
বিয়ে হয়েছিল মুম্বাইয়ের এক বড় শিল্পপতি পরিবারে, কিন্তু
শ্বশুরমশাইয়ের অনুরোধে সে ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবা থেকে ইস্তফা দিয়ে তাদের
টেলিকম কোম্পানির চিফ এক্সিকিউটিভ হওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করল এবং খুব দক্ষতার
সঙ্গে ব্যবসার প্রসার ঘটাল। এখন আমাদের কথাবার্তা কদাচিৎই হয়, আর তাও শুধু হাই-হ্যালো পর্যন্ত সীমাবদ্ধ।
তখন
আমি জম্মু প্রদেশের ডিভিশনাল কমিশনার ছিলাম, যখন একদিন নম্রতার
ফোন এল—
“ইকবাল! আমি জম্মু আসছি, আমার দুই সন্তান আর সাংবাদিক বান্ধবী কে নিয়ে। আমি তোমার
বাড়িতেই উঠব। আমার সঙ্গে কোম্পানির সার্ভে টিমও আসছে। তুমি তাদের জন্য কোনো ভালো
হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করে দিও। সব খরচ কোম্পানি বহন করবে। সে দিক থেকে তোমাকে
একদম চিন্তা করতে হবে না। আমরা জম্মুতে টেলিকম ইউনিট বসাতে চাই।”
তিন–চার দিন পর নম্রতা তার দলের সদস্যদের নিয়ে জম্মু পৌঁছে গেল। টিমের জন্য আমি এশিয়া হোটেলে ব্যবস্থা করে রেখেছিলাম, আর নম্রতা তার বাচ্চাদের ও সাংবাদিক বান্ধবী কে নিয়ে আমার সরকারি বাংলোয় এসে উঠল। ওর আমার বাড়িতে থাকা আমাকে খুবই আনন্দ দিয়েছিল। আমরা বড় আগ্রহ নিয়ে জীবনের পাতা উল্টেপাল্টে দেখছিলাম—শৈশব, কচি বয়স আর তরুণ বয়সের গল্পের স্মৃতিচারণ করেছিলাম, আর বর্তমান দায়িত্বের আক্ষেপ করে বলেছিলাম।
সার্ভে টিম
তাদের কাজ শেষ করে রিপোর্ট নম্রতার হাতে তুলে দিয়েছিল। তারা মীরাঁ সাহেবের নিকটবর্তী
পুরনো অনাবাদি জমির ২০ একর মতো একটি প্লটকে উপযুক্ত বলে চিহ্নিত করেছিল। আমি
ডেপুটি কমিশনার ও তহশিলদারকে তাড়াতাড়ি নথিপত্র প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়েছিলাম,
যাতে জমির রেজিস্ট্রির প্রক্রিয়া শুরু করা যায়।
একদিন আমরা সবাই ছাদে বসে সিয়ালকোট শহরের জ্বলজ্বলে আলো দেখছিলাম, তখন নম্রতা ও তার সাংবাদিক বান্ধবী সীমান্ত দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করল। আমি রণবীর সিংহপুরার তহশিলদার কে ফোন করে সীমান্ত পরিদর্শনের ব্যবস্থা করতে বললাম। পরের দিন আমরা সবাই সুচেতগড় সীমান্তে পৌঁছালাম। সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা লাঞ্চের ব্যবস্থা করেছিলেন। তহশিলদার ও তার কর্মচারীরা, আর নিরাপত্তা বাহিনীর জওয়ানরা সেবার জন্য উপস্থিত ছিলেন। আমরা সবাই সেই হলেই লাঞ্চ করেছিলাম যেখানে ১৯৭৩ সালে ভারত–পাকিস্তানের মিলিটারি কমান্ড যুদ্ধবিরতি কে বাস্তব নিয়ন্ত্রণরেখায় রূপান্তর করেছিল এবং এ-সংক্রান্ত মানচিত্রের আদান–প্রদান করেছিল।
লাঞ্চের পরে আমি নম্রতা, তার বাচ্চাদের এবং সাংবাদিক বান্ধবী কে নিয়ে গেট পেরিয়ে ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এর মাঝখানে থাকা ব্যারিয়ার পর্যন্ত গেলাম, যার ওপারেই ছিল পাকিস্তানের জমি। খুঁটির পাশে কংক্রিটের তৈরি সীমান্ত স্তম্ভ দাঁড়িয়ে ছিল, যেটিকে এক পিপল গাছ তার শিকড়ে ঢেকে ফেলেছে। এখন এই পিপল গাছটি অর্ধেক ভারত আর অর্ধেক পাকিস্তান হয়ে গেছে। একে যদি রাজনৈতিক নির্যাতন না বলা যায়, তবে আর কী-ই বা বলবেন?
ব্যারিয়ারের ওপারে পাকিস্তানি পাঞ্জাব থেকেও বিপুল সংখ্যক মানুষ সীমান্ত দেখার জন্য এসেছিল। পাকিস্তানি শিশু আর তরুণ-তরুণীরা আমাদের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে খুশি হচ্ছিল। আমাদের দিক থেকেও একই উষ্ণতা ছিল। তখন আমি দেখলাম, এক চঞ্চল তরুণী—তার নিজের কুমারী স্বপ্নের মাদকতায় ভরা, দেহমাটি থেকে বৃষ্টিভেজা গন্ধ ছড়াতে ছড়াতে—নম্রতার কাছে এসে দাঁড়াল। সে সালাম জানিয়ে নম্রতার খোঁজখবর নিতে লাগল। নম্রতাও তার সঙ্গে সহজভাবেই কথা বলতে লাগল। দুইজনেই গল্পে মেতে উঠল। হঠাৎ নম্রতার নজর পড়ল তার জরি-ওয়ালা পাঞ্জাবি জুতোর দিকে। নম্রতা জুতোর প্রশংসা করে জিজ্ঞেস করল—এই সুন্দর জুতোটি কোথায় তৈরি?
“কসুরের জুতো। আপনি আমাদের সুরিন্দর কৌরের গান শোনেননি নাকি… ‘জুত্তি কসুরি, প্যারি ন্ পুরী, হায় রাব্বা ওয়ে সানু তুরণা পেয়া’… আর কসূরের জুত্তি আর খুস্সা (পুরূষদের জুতো) সারা দুনিয়ায় বিখ্যাত,” — তরুণীটি বলল।
সে একটি পায়ের জুতো খুলে নম্রতার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “বাজি! আপনি পায়ে দিয়ে দেখে নিন… কেমন মানায়।”
নম্রতা জুতোটি পায়ে দিল, আর সেটি পুরোপুরি ফিট হয়ে গেল। তখন তরুণীটি আরেক পায়ের জুতো টিও খুলে নম্রতার দিক এগিয়ে দিল। নম্রতা দু’পায়ে জুতো পরে একটু হেঁটে দেখল।
“বাজি! এই জুত্তি আপনার পায়ে দারুণ মানিয়েছে,” পাকিস্তানি তরুণীটি স্নেহভরে বলল।
“তোমার নাম কী? তুমি কোথা থেকে এসেছ?”
“আমার নাম আলিয়া
খোখর। আমি দাস্কা থেকে সীমান্ত দেখতে এসেছি। দাস্কা সিয়ালকোটের কাছে একটি বড়
শহর। আর আপনি কোথা থেকে এসেছেন?”
নম্রতা জবাব দিল, “আমি মুম্বাই থেকে
এসেছি, আর আমরাও সুচেতগড় সীমান্ত দেখতেই এখানে এসেছি।”
“আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে খুব আনন্দ পেলাম। আমার তো মন ভরে গেল। এখন আমার একটি ছোট্ট অনুরোধ আছে। দয়া করে না বলবেন না। আমার এই ছোট্ট ইচ্ছে পূরণ করে আমাকে সম্মান দেবেন আর আমার মান রাখবেন।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, বলো… তোমার ইচ্ছে কী?”
“বাজি,পা থেকে এই জুত্তি আর খুলবেন না। এটিকে ছোট বোনের উপহার মনে করে রাখুন—এই দেখা-সাক্ষাৎকে স্মরণীয় করে দিন।”
নম্রতা বলল, “তোমার ব্যবহার তো সত্যিই মানিক-মুক্তর মতো, কিন্তু আমি তোমার
উপহার গ্রহণ করতে পারছি না। তুমি জুতো ছাড়া খালি পায়ে কীভাবে যাবে?”
আলিয়া হেসে বলল, “বাজি, কোনো সমস্যা নেই। আপনি চিন্তা করবেন না। গেটের বাইরে আমার গাড়ি দাঁড়ানো আছে। তাতে আমার আরেক জোড়া জুতো রাখা আছে। আমি সহজেই গেট পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারব।”
আমি নীরবে
দাঁড়িয়ে এই মনোরম দৃশ্য দেখছিলাম। নম্রতা চোখ ফিরিয়ে আমার দিকে তাকাল। আমি
ইশারায় তাকে উপহার গ্রহণ করতে বললাম। নম্রতা আলিয়াকে বুকে জড়িয়ে ধরল, তাকে দোয়া দিতে
লাগল এবং বলল—“ঈশ্বর করুক আমাদের ভাগাভাগি করা নদীগুলো চিরদিন ভালোবাসার
সুরে বয়ে যাক। কোনোদিন যেন এদের বুকে বন্যা না আসে।”
আলিয়া বলল, "আল্লাহ আপনার দোয়া কবুল করুন এবং দুই দেশের ওপর তাঁর
রহমতের বৃষ্টি বর্ষণ করে যাক।”
“নম্রতা খুব খুশি। সে বেশ আবেগপ্রবণ
হয়ে পড়েছিল। গাড়িতে বসে সে দুই দেশের শান্তি–সম্প্রীতির জন্য
প্রার্থনা করছিল। তারপর সে আমাকে বলল - “ইকবাল!মুম্বাই পৌঁছে আমি এই হৃদয়স্পর্শী ঘটনাটি আমার
চলচ্চিত্র প্রযোজক বন্ধুকে বলব এবং তাকে এই বিষয়টি নিয়ে একটি চলচ্চিত্র তৈরি
করতে বলব, যাতে ঘৃণার দেয়াল ভাঙতে আমরাও একটু
অবদান রাখতে পারি।”
নম্রতার সাংবাদিক বান্ধবীও চনমনে হয়ে উঠছিল। সে বলল, আমিও সংবাদপত্রের জন্য এই সুন্দর সাক্ষাতের ওপর ভিত্তি করে একটি গল্প লিখব, তবে আমার গল্পটি এক নতুন মোড়ে গিয়ে শেষ হবে।”
“নতুন মোড়…! সেটা আবার কী?”
“আমার গল্পে নম্রতা আলিয়াকে পাটিয়ালার জুত্তি উপহার দেবে।”
“ধুর! তুমি এখানেও ফাঁকি দেবে নাকি!”
নম্রতা হেসে তার বান্ধবী কে খোঁচা
দিতে লাগল… আর দু’জনে হো হো করে হেসে উঠল।
----
লেখক পরিচিতি — খালিদ হুসেইন
০১ এপ্রিল ১৯৪৫ সালে জম্মু–কাশ্মীরের উধমপুরে জন্ম। স্নাতক ডিগ্রি এবং সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা। চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে কর্মরত ছিলেন। উর্দু, হিন্দি, ইংরেজি, পাহাড়ি, গুজরি, ডোগরি, কাশ্মীরি এবং পাঞ্জাবি প্রভৃতি ভাষায় দক্ষ।
প্রখ্যাত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক পত্রিকায় প্রায় ১৫০টি গল্প প্রকাশিত। ৮০টির বেশি গল্প উর্দু, হিন্দি, ইংরেজি ও মালয়ালম ভাষায় অনূদিত। পাঞ্জাবিতে ১৩টি এবং উর্দুতে ৮টি গ্রন্থ প্রকাশিত। আত্মজীবনী “মাট্টি কুদম করুন্দি ইয়ার” এবং কিছু গল্প-সংকলন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঞ্জাবি এম.এ./এম.ফিল. পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত।
পুরস্কার —
২০২১ সালে পাঞ্জাবি গল্প-সংকলন “সূলাঁ দা স্যালন”-এর জন্য সাহিত্য
অকাদেমি পুরস্কার।
২০১৪ সালে পাঞ্জাব সরকারের ভাষা বিভাগ কর্তৃক শিরোমণি পাঞ্জাবি সাহিত্যকার
সম্মান।
জম্মু ও কাশ্মীরের শিল্প, সংস্কৃতি ও ভাষা অকাদেমি কর্তৃক “তে জেলম বাগদা
রেহা” এবং “গোরি ফসল দে
সৌদাগর” গল্প-সংকলনের জন্য প্রথম পুরস্কার প্রাপ্ত।
কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন - নির্বাচিত পঞ্জাবি গল্প সংকলন, জানুয়ারি ২০২৬ (ভাষা সংসদ, কলকাতা)
कोई टिप्पणी नहीं:
एक टिप्पणी भेजें